ঢাকা২৩শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সৌন্দর্যের প্রাকৃতিক উপাদান

বার্তা বিভাগ
মে ১৩, ২০২৪ ৯:০১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

আনোয়ার হোসেন, গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধিঃ পল্লী কবি জসীম উদ্দীন ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায় লিখেছেন—‘তুমি যাবে ভাই–যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়। বাঙালির প্রাণ হলো গ্রামের সাদামাটা পরিবেশ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সহজ-সরল মানুষ, অভাব-আবেগ, গাঁয়ের মেঠোপথ, হিজলের বন। গ্রামীন জীবনের শান্তির নীড় গ্রামবাংলা, যেখানে লুকিয়ে আছে ভালবাসার প্রকৃতির পরশ ছায়া। ভালবাসা ভালো লাগার মায়ার বাঁধন!

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানুষ নানা কাজে গাছ ব্যবহার করে আসছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, জ্বালানি, ওষুধ কিংবা সাংস্কৃতিক উপকরণ, দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব উপকরণের জন্যই গাছের প্রয়োজন। গাছও তার গোটা সত্তাকে মানবসভ্যতার জন্য বিলিয়ে দিয়েছে। প্রাবন্ধিক মোতাহার হোসেন চৌধুরীর ভাষায়, ‘যা তার প্রাপ্তি তাই তার দান।’ যে বৃক্ষ তার প্রাপ্তির সবটুকুই ঢেলে দিয়েছে মানবসভ্যতার প্রয়োজনে, সেই মানুষই কিনা নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করছে স্বার্থের নেশায় অন্ধ হয়ে!

আমাদের সংস্কৃতিতে গাছ বিশাল স্থান দখল করে আছে। একটা সময় গ্রামীণ জনপদের হাটবাজারগুলো গড়ে উঠত বিশাল কোনো বট কিংবা অশ্বত্থগাছকে কেন্দ্র করে। পথের পাশে ছায়াদানকারী বৃক্ষের নিচে বসে পথিক খানিক বিশ্রাম নেন। এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।

শীতকালে পিঠা–পুলি তৈরির অন্যতম উপকরণ ছিল খেঁজুরের রস। গাছিরা ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছ থেকে হাঁড়ি নামিয়ে রস সংগ্রহ করতেন। বধূরা সেই রস থেকে গুড় সংগ্রহ করতেন, আর গুড়ের ঘ্রাণে মৌ মৌ করত চারদিক। রাস্তার পাশে সারি সারি খেজুরগাছের সেই মনোরম দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না।
বাবুই পাখির বাসস্থান হিসেবে পরিচিত তালগাছ। কয়েক দশক আগেও রাস্তার পাশে তালগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মানুষ বিশ্রাম নিত, গাড়ির জন্য অপেক্ষা করত। বাবুই পাখির অস্থির ছোটাছুটি ও বিস্ময়কর স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন ঢোলের মতো ছোট্ট বাসাটি দেখে পুলকিত হতেন পথিক। রাস্তা সংস্কার ও বর্ধিতকরণের নামে আবহমান বাঙালি ঐতিহ্যের এই গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। বর্ষাকালে গ্রামাঞ্চলে কদমের গন্ধে আমোদিত হতো চারদিক। সাদা-কমলা রঙের গোলাকার ফুলে ভরে যেত গাছগুলো। বর্ষা–পরবর্তী সময়ে যখন খাদ্যের আকাল চলত, তখন এই শুকনো ফুলগুলোই পাখিদের খাদ্য। কদম্ব বৃক্ষের তেমন অর্থনৈতিক গুরুত্ব না থাকার অজুহাতে কাটা পড়ে গেছে অধিকাংশ গাছ।

পলাশ ও শিমুল ফুল বাংলায় বসন্তের বার্তা নিয়ে আসে। রাস্তার ধারে সারি সারি শিমুল–পলাশের রক্তিম আভা যে কারও মন হরণ করে নেবে। কিন্তু এ গাছগুলোও হারিয়ে যাওয়ার পথে। গ্রামের অধিকাংশ বাড়ির উঠানে একটি করে শিউলি ফুলের গাছ শোভা পেত। শিশু–কিশোরেরা উঠানে পড়ে থাকা ফুল কুড়িয়ে নিত তাদের খেলার উপকরণ হিসেবে। বকুলগাছও ছিল। সেই ফুল দিয়ে মালা গেঁথে নিজেদের সাজিয়ে নিত গ্রামের কিশোরীরা।

পুকুরপাড়ের ঝাঁকড়া ডুমুরগাছেরও এখন আর দেখা মেলে না। ডুমুরগাছের পাতায় বাসা বাঁধে ছোট্ট টুনটুনি। আর ডুমুর ফল পাখিদের প্রিয় খাবার। হলুদ রঙের ঝুমকো আকৃতির ফুল সোনালু। গাছভর্তি ঝুলন্ত হলুদ সোনালু ফুলের সেই মনোহর দৃশ্য দেখলে মনে হয় গাছটায় অনেকগুলো হলুদ প্রজাপতি বসে আছে। ঝাঁকি দিলেই উড়ে যাবে। পুকুরপাড়ে এখন আর বিশাল বাঁশঝাড় চোখে পড়ে না। গ্রমীণ ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের অন্যতম উপাদান গাছগুলোকে একে একে হারিয়ে ফেলছি।

এসব বৃক্ষকে কেন্দ্র করে যে পাখিরা বেঁচে থাকত, তারাও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। গ্রামবাংলার চিরায়ত সেই ঘুঘুডাকা ছায়াঢাকা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। বাংলা সাহিত্যে—গল্প, কবিতা, উপকথায় বর্ণিত অনেক গাছ ও পাখি আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের উচিত অনাবাদি পতিত জমি কিংবা রাস্তার ধারে, জলাশয়ের পাড়ে ব্যাপক হারে দেশি বৃক্ষ রোপণ করা। এতে যেমন আমাদের আবহমান কালের ঐতিহ্য টিকে থাকবে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে হয়। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বে-আইনি। যোগাযোগ: হটলাইন: +8801602122404 ,  +8801746765793 (Whatsapp), ই-মেইল: [email protected]