ঢাকা১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

এক উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর ব্যথাতুর জীবনের নাম বেদে সম্প্রদায়

বার্তা বিভাগ
এপ্রিল ২২, ২০২৪ ৬:০৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আনোয়ার হোসেন, গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধিঃ
‘আমি এক দূরন্ত যাযাবর, রাত নেই দিন নেই বসে থাকি গাড়িতে পথেই বেঁধেছি ঘর।’ এ গানটিতে পরিচয় মেলে বেদে সম্প্রদায়ের জীবন বৈচিত্র্যের।
বেদেরা বাংলাদেশের অতিপরিচিত প্রান্তিক যাযাবর গোষ্ঠী। ভূমিহীন এই মানুষেরা দলবদ্ধভাবে নৌকায় বাস করে। এরা এক ঘাটে রান্ধে বারে আরেক ঘাটে খায় এরপরও তাদের সুখের সীমা নেই। এ জন্য তাদের জলের জিপসিও বলা হয়।

এদের জীবন বৈচিত্রে রয়েছে সাপের খেলা দেখানো। ‘অরুন, বরুন, কিরণমালা আমরা সাপ খেলা দেখাই, মোদের খুশীর সীমা নাই।’ সাপের এ খেলা দেখানোর জন্যই এরা বেশি জনপ্রিয়। বেদেদের বাদিয়া, বাইদ্যা বা বইদ্যানী নামেও ডাকা হয়। সর্বজনের কাছে বেদে সম্প্রদায় যাযাবর জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে ‘এরা মূলত নৌকায় বসবাস করে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। আটটি গোত্রে বিভক্ত এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে মালবেদে, সাপুড়িয়া, বাজিকর, সান্দার, টোলা, মিরশিকারি, বারিয়াল সান্দা ও গাইন বেদে প্রধান। মূল পেশা ক্ষুদ্র ব্যবসা হলেও শিঙ্গা লাগানো, তাবিজ বিক্রি, সাপ খেলা, সাপের কামড়ের চিকিৎসা, সাপ বিক্রি, আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য সেবাদান, ভেষজ ওষুধ বিক্রি, কবিরাজি, বানরখেলা দেখানো, চুড়ি–ফিতা বিক্রি, জাদু দেখানো ইত্যাদি তাদের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন।’

তবে এদের জীবনধারার শুরুটা ঠিক এভাবে ছিল না। বহুকাল ধরে তাদের নৌকাতেই বসবাস ছিল। বিভিন্ন নদীতে ছিল তাদের দল বেঁধে চলাফেরা। ছোট ছোট নৌকার বহর নিয়ে দেখা যেত এদের নদীবন্দরে। কিন্তু সময়ের আবর্তনে বাংলাদেশ থেকে নদীগুলো সংকুচিত হতে থাকে, সেই সঙ্গে সংকুচিত হয় বেদেদের জীবনও। এভাবে বেদেরা জীবনের তাগিদে একসময় উপকূলে আসা শুরু করে। একপ্রকার বাধ্য হয়েই বহু বেদে পরিবার এখন বসবাস শুরু করেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে। ঢাকার সাভার, মুন্সিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাজীপুরের জয়দেবপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, মিরেরসরাই, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, ইত্যাদি জায়গায় এদের বসবাস দেখা যায়। একই সঙ্গে কূলে এসে বেদেদের জীবনে বেড়েছে নানাবিধ শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা। একদিকে যেমন নেই তাদের নিরাপদ মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই, অন্যদিকে আছে পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েদের ভরণপোষণ ও শিক্ষা–চিকিৎসাজনিত বিশাল সমস্যা। বর্তমানে বেদেরা সম্পূর্ণ ঠিকানাবিহীন ও অনিশ্চিত। এদের কুঁড়েঘরের ছাউনি হয় শত ছিন্ন পলিথিন কিংবা নাইলনের অথবা সিমেন্টের ব্যাগে। আর খেজুরপাতার পাটি দিয়ে তৈরি বিছানা।

শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত ও বসন্ত সব ঋতুতেই ছেলেমেয়ে, স্ত্রী নিয়ে অবস্থান করে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। জীবিকার সন্ধানে ওরা ছুটতে থাকে এদিক–ওদিক। পুকুর, ডোবা বা জলাশয়ে কারও সোনা-রুপা হারিয়ে গেলে উদ্ধার করে দেয় তারা। নানা প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে কোনোমতে বেঁচে আছে। অবহেলিত এই বেদে-বেদেনিরা সভ্য মানুষের চোখের সামনে দিয়ে অবলীলায় এদের জীবন কাটালেও কোনো মানুষই তাদের জীবন নিয়ে ভাবে না অথবা তাদের পুনর্বাসনের কথা কেউ চিন্তাও করে না।

ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানোর ইচ্ছা থাকলেও পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে সম্ভব হয় না। যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে দিন কাটে। কঠিন রোগ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ঝাড়ফুঁকে সারলে তো ভালোই অন্যথায় মৃত্যু অনিবার্য।

বর্তমান আধুনিক সমাজে যেকোনো মানুষের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত। অন্ততপক্ষে খাদ্য, বস্তু, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সুযোগ রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকেরই অধিকার। তাই বর্তমান সময়ে আমাদের উন্নয়নশীল এ দেশে অবহেলিত এই বেদে সম্প্রদায়কে নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অবশ্য এ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর ‘বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’ নামে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে। তবে তা কতটুকু ফলপ্রসূ হচ্ছে, তা-ই এখন দেখার বিষয়। আর আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে অবহেলিত এই যাযাবর সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়ন ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরকার ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে হয়। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বে-আইনি। যোগাযোগ: হটলাইন: +8801602122404 ,  +8801746765793 (Whatsapp), ই-মেইল: [email protected]